Go to media page Available in: English   Bengali  

আমাদের জীবনে সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন রাদ্বি’আল্লাহু’আনহুর গুরুত্ব

মওলানা শেখ মুহাম্মাদ হিশাম কাব্বানি قَدَّسَ اللّٰهُ سِرَّهُ

২৩ অক্টোবর ২০১৫, ফেলথাম, লন্ডন, যুক্তরাজ্য

সেন্টার ফর স্পিরিচুয়াল অ্যান্ড কালচারাল অ্যাডভান্সমেন্ট (সিএসসিএ)-তে জুমআর খুতবা

আস-সালামু আলাইকুম।

হে বিশ্বাসীগণ, হে মুসলমানগণ! আলহামদুলিল্লাহ যে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) আমাদের অন্তরে নূর আল-ঈমান বা ঈমানের আলো এবং নূর আল-ইসলাম বা ইসলামের আলো দিয়েছেন। তিনি "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আলাইহা নাহইয়া ওয়া আলাইহা নামুতু ওয়া আলাইহা নালকআল্লাহ, ইনশাআল্লাহ" (আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, এর ওপরই আমরা বাঁচি, এর ওপরই মরি এবং এর ওপরই আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করব) এই স্বাক্ষ্য দেয়ার তওফিক দিয়েছেন এবং মুমিন-মুসলমান হিসেবে আমাদের গড়ে তুলেছেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের দিকে তাকিয়ে দেখেন যে তাদের তাঁর সাহায্যের প্রয়োজন কি না, কারণ আল্লাহর সাহায্য ছাড়া জান্নাতে প্রবেশের কোনো উপায় নেই। আল্লাহ 'কুন ফা ইয়াকুন' (হও, আর তা হয়ে যায়) এর মাধ্যমে তাঁর মুমিন ও মুসলিম বান্দাদের জন্য এবং সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ এর প্রেমিকদের জন্য এমন ব্যবস্থা করেছেন যা "মা লা আইনুন রায়াত ওয়া লা উযুনুন সামিআত ওয়া লা খাতারা আলা কালবি বাশার" অর্থাৎ যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে যা কল্পনাও করা হয়নি। আল্লাহ আপনাদের জন্য তাই প্রস্তুত করে রেখেছেন।

প্রত্যেকেই তার তাকদিরে যা আছে তার পেছনে ছুটছে যা একেকজনের জন্য একেক রকম। কারো তাকদিরে হয়তো চীনে যাওয়া আছে আবার কারো তাকদিরে মদিনাতুল মুনাওয়ারায় যাওয়া আছে, এর মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। হয়তো আপনার ভাগ্যে মুসলিম হওয়া লেখা ছিল তাই আপনি সেদিকেই ছুটেছেন। আবার হয়তো আপনার ভাগ্যে মুমিন হওয়া লেখা ছিল যা মুসলিম হওয়ার চেয়েও উচ্চতর স্তর, কারণ ঈমান হলো ইসলামের মূল।

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُُ

অর্থ: আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম। (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯)

গুগল স্কাই-তে আপনারা যেমন গ্যালাক্সি ও নক্ষত্রমণ্ডল দেখার জন্য জুম করে গভীরে যান এবং এমন সব বিষয় উন্মোচন করেন যা আপনারা কখনো ভাবেননি, ইসলামও তেমনি, বরং তার চেয়েও বিশাল। ইসলাম মহাবিশ্বের চেয়েও বড়, ইসলাম সৃষ্টির চেয়েও মহান।

إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللّهِ الإِسْلاَمُُ

অর্থ: আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হলো ইসলাম। (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৯)

আল্লাহর কাছে ধর্ম হলো ইসলাম যা তিনি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ এর মাধ্যমে তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন এবং এটিই সর্বোত্তম। আপনি যত জুম করবেন বা গভীরে যাবেন, তত বেশি পুরস্কার পাবেন যা আপনার ধারণক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।

لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا لَهَا مَا كَسَبَتْ وَعَلَيْهَا مَا اكْتَسَبَتْ

অর্থ: আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। সে যা ভালো উপার্জন করে তা তার জন্যই এবং যা মন্দ উপার্জন করে তার প্রতিফলও সেই ভোগ করে। (সূরা বাকারা, ২:২৮৬)

আল্লাহ আপনাকে আপনার বহন ক্ষমতার বেশি বোঝা দেন না। শিশুদের দিকে হীরা ছুড়ে মারলে কী লাভ যদি তারা এর মূল্যই না জানে? আপনি তাদের ক্যান্ডি দিলে তারা হীরার চেয়ে সেটাই বেশি পছন্দ করবে। একইভাবে আল্লাহ আমাদের যে হীরা দিয়েছেন আমরা তা ছুড়ে ফেলছি এবং খোলসের পেছনে ছুটছি। আপনারা মূলের দিকে যান যা হলো মাকামে ইহসান বা নৈতিক উৎকর্ষ।

أن تعبد الله كأنك تراه، فإن لم تكن تراه فإنه يراك

অর্থ: আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করো যেন তুমি তাঁকে দেখছো, আর যদি তুমি তাঁকে না দেখো, তবে নিশ্চয়ই তিনি তোমাকে দেখছেন। (বুখারী)

আল্লাহ মুসলিমদের এই নিয়ামত দিয়েছেন। আরও বেশি পাওয়ার জন্য জুম করুন বা গভীরে যান যা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আজকাল বলা হয় "বাই ওয়ান গেট ওয়ান ফ্রি" কিন্তু ইসলামের ক্ষেত্রে কোনো দরদাম নেই, সব নিয়ে নিন, শুধু আপনারা আসুন। আল্লাহ আপনাদের আশ্রয় দেবেন, ছায়া দেবেন। গরমের দিনে যখন তাপমাত্রা ৪০ বা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস কিংবা ১০০ বা ১২০ ফারেনহাইট হয় তখন মানুষ কত কষ্ট পায় এবং কোথায় পালাবে তা ভাবে। তারা এমন জায়গা খোঁজে যেখানে ছায়া আছে। আল্লাহ আপনাদের ছায়া দিচ্ছেন। আল্লাহ মুমিন ও মুসলিমদের ছায়া দিয়েছেন।

নবীজি ﷺ যে ইসলামের বার্তা এনেছেন তা কিয়ামতের দিন আমাদের জন্য ছায়া হবে। একারণেই সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম) এবং আহলে বাইত বা নবী পরিবার সেই ছায়াই চেয়েছিলেন। তাঁরা শহীদ হয়ে সেই ছায়া হারাতে চাননি, তাই তাঁরা এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং উম্মাহকে দেওয়ার জন্য যা নিজের হাতে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল তা নিয়েছিলেন। তাঁরাই উম্মাহকে দিতে পারেন, সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম) এর বিরোধীরা নয়। তবে আমরা সেই বিচারের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম, আমরা এই আলোচনায় যাব না কারণ আমরা কোনো ভুল করতে চাই না, আল্লাহই ভালো জানেন।

এই পবিত্র আশুরার দিনে আল্লাহ সাইয়্যিদিনা আদম (আলাইহিসসালাম) কে তাঁর গুনাহ থেকে ক্ষমা করেছিলেন। আল্লাহ তাঁকে তওবা করার জন্য পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং তাঁকে ক্ষমা করে ইবলিসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। ইবলিস আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করেছিল এবং সেজন্য আল্লাহ তাকে অভিশপ্ত করেছিলেন আর সাইয়্যিদিনা আদম (আলাইহিসসালাম) কে ক্ষমা করেছিলেন। আপনি যদি মুসলিম হন তবে এর অর্থ হলো আপনাকে ক্ষমা করা হয়েছে এবং সেই ক্ষমা আপনার পেছনে ছুটছে। আপনি যেখানেই যান ক্ষমা আপনার পেছনে থাকে। আপনি যদি ভুল করেন এবং বলেন "আস্তাগফিরুল্লাহ" তবে সেই ভুল মুছে যায়, তা আর থাকে না।

আল্লাহ আমাদের ছায়া দিয়েছেন এবং সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম) তা জানতেন। ইয়াজিদের ১০,০০০ সৈন্যের মোকাবেলায় তাঁরা ছিলেন মাত্র ৭২ জন। ১০,০০০ এর বিপরীতে ৭২ জন কী করতে পারে? কিছুই না। কিন্তু তাঁরা এগিয়ে গিয়েছিলেন কারণ তাঁরা ভবিষ্যতের দিগন্তে তাকিয়ে দেখেছিলেন যে সবাই তাঁদের নাম স্মরণ করবে, তাঁদের সাহসিকতা, তাঁদের তাকওয়া এবং তাঁদের সততার কথা স্মরণ করবে। এটাই যথেষ্ট যে বলা "হে প্রভু! আমি আমার নবী সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ কে ভালোবাসি এবং আমি তাঁর পরিবারকে ভালোবাসি।" আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করুন তবে এই ভালোবাসাই আপনাদের বিনা হিসাবে জান্নাতে নিয়ে যাবে।

يحشر المرء مع من أحب

অর্থ: মানুষ যাকে ভালোবাসে তার সাথেই তার হাশর হবে। (তাবারানী)

আপনি যদি নবীজি ﷺ কে ভালোবাসেন তবে আপনি তাঁর সাথেই থাকবেন। আপনি যদি দুনিয়া এবং রাজা বাদশাহদের ভালোবাসেন তবে আপনি তাদের সাথেই থাকবেন। আপনি যদি আখেরাতের রাজা ও সুলতানদের ভালোবাসেন তবে আপনি নবীজি ﷺ এর সাথে থাকবেন। তাই আপনাকেই বেছে নিতে হবে। সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম) কোনো কথাই শুনতে চাননি যখন লোকেরা এসে বলেছিল "মদিনায় ফিরে যান, তারা আপনাকে ইরাকে হত্যা করতে চায়।"

তিনি বলেছিলেন "স্বাগতম! তারা যদি আমাকে হত্যা করতে চায় তবে আমি আমার প্রভুর সাথে আগেই সাক্ষাৎ করতে যাব এবং আমি এর জন্য প্রস্তুত।"

তারা তাঁকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল। তাঁর রক্তের প্রতিটি ফোঁটা বলছিল "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ"। যদি তাঁর রক্ত ঝরানো না হতো তবে সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম), সাইয়্যিদিনা আল-হাসান (আলাইহিসসালাম) এবং আহলে বাইতের চেয়ে কে আর উত্তমভাবে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" বলতে পারত? আমাদের তাঁদের ত্যাগের অর্থ বুঝতে হবে। তাঁরা কেবল তাঁদের সম্পদই ত্যাগ করেননি, তাঁরা তাঁদের গহনা, উট এবং বাড়িঘর দান করেননি বরং তাঁরা দুনিয়াই ছেড়ে দিয়েছিলেন। কারণ তাঁরা দুনিয়ার পরোয়া করতেন না। তাঁরা তাঁদের ওপর অত্যাচারকারীদের বলেছিলেন "তোমরা দুনিয়ার চেয়ারে বসার জন্য এসেছ? আমার এটার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি জান্নাতের অন্য এক আসনে বসতে যাচ্ছি। আল্লাহ আমার জন্য জান্নাতে আমার প্রিয় নানাজান সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ এর পাশে একটি সিংহাসন প্রস্তুত করবেন।"

যুবকদের সর্দার এবং শহীদদের সর্দার সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম) কে শহীদ করার পূর্বে তাঁর চোখের সামনেই তাঁর সন্তানদের শহীদ করা হয়েছিল। গুলি করে বা তলোয়ারের আঘাতে নয়। আপনারা যখন ছুরি বা করাত দিয়ে মাংসের টুকরো কাটেন তখন ব্লেডটি সামনে পিছনে করতে হয় যেমন গাছ কাটার সময় করা হয়। কল্পনা করুন করাত দিয়ে কারো ঘাড় শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে এবং ঘাড় কাটা না হওয়া পর্যন্ত তা সামনে পিছনে করা হচ্ছে। আপনারা কি কল্পনা করতে পারেন সাইয়্যিদিনা হুসাইন (আলাইহিসসালাম) কতটা ব্যথা পেয়েছিলেন? কিন্তু করাতের প্রতিটি নড়াচড়ার সাথে সাথে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) তাঁকে জান্নাতের পর জান্নাতের পোশাকে ভূষিত করছিলেন এবং তাঁকে তাঁর পরিবারের সাথে উঁচুতে ওঠানো হচ্ছিল। আল্লাহর প্রেমে কোনো ব্যথা নেই, সেখানে কেবল তাঁর জন্য আকুলতার ব্যথা আছে। সাইয়্যিদিনা হুসাইন (আলাইহিসসালাম) দেখেছিলেন যে জান্নাতে যাওয়ার পথ সংক্ষিপ্ত তাই তিনি সেই সুযোগ হারাতে চাননি। তিনি বলেছিলেন "তোমরা আমাকে মারতে চাও? এসো!" আমাদের চোখে তাঁকে নৃশংসভাবে শহীদ করা হয়েছিল কিন্তু তাঁর দৃষ্টিতে তিনি খুব খুশি ছিলেন। তিনি তাঁর ঝরে পড়া প্রতিটি রক্তের ফোঁটার বিনিময়ে নবীজি ﷺ এর উম্মতের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন। সাইয়্যিদিনা হুসাইন (আলাইহিসসালাম) যদি বলেন "ইয়া রাব্বি!" আল্লাহ বলেন "ইয়া আবদি!"

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) হাদিসে কুদসিতে বলেছেন:

عبدي اطعني أجعلك ربانيا تقول لشيئ كن فيكون

অর্থ: হে আমার বান্দা! আমার আনুগত্য করো, আমি তোমাকে রব্বানি বা প্রভুত্বময় গুণাবলি দান করব,

তখন তুমি কোনো কিছুকে "হও" বললে তা হয়ে যাবে (অস্তিত্ব লাভ করবে)। (হাদিসে কুদসি)

"তুমি যদি আমাকে গ্রহণ করো তবে আমি তোমাকে আসমানি ক্ষমতায় ভূষিত করব যাতে তুমি কোনো কিছুকে 'হও' বললে তা হয়ে যাবে।" সাইয়্যিদিনা হুসাইন (আলাইহিসসালাম) সাধারণ কোনো ব্যক্তি নন। তিনি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ এর নাতি, মাওলা আলীর (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) সন্তান এবং জান্নাতের নারীদের সর্দার মা ফাতেমা আয-জাহরা (আলাইহিসসালাম) এর সন্তান। তিনি কর্তিত হওয়াকে আরও বেশি উপভোগ করছিলেন এবং উম্মতের জন্য আরও বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করছিলেন। তিনি পাঁচ মিনিটেই শেষ করতে চাননি, তিনি আরও চেয়েছিলেন। আমরা যা চেয়েছিলাম আল্লাহ তাঁকে তাই দিয়েছেন।

কারবালার ফুটন্ত গরমে মরুভূমির সূর্যের নিচে যেখানে আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া ছিল না, সেখানে তিনি তাঁর তৃষ্ণার্ত সন্তানদের জন্য পানি চেয়েছিলেন। তাঁরা তৃষ্ণার্ত ছিলেন কিন্তু জালিমরা তাঁদের পানি দেয়নি। খুব ছোট শিশু আলী আল-আসগর (আলাইহিসসালাম) এবং আলী আল-আকবর (আলাইহিসসালাম) যাদের বয়স নয় বা সাত বছর ছিল তাদের কোনো পানি দেওয়া হয়নি। অথচ কেউ মুমূর্ষু অবস্থায় থাকলে সুন্নাহ হলো চামচ বা আঙুল দিয়ে আলতো করে তাদের মুখে পানি দেওয়া। কিন্তু তারা সেই সুন্নাহর তোয়াক্কা করেনি এবং তাঁকে তাঁর সন্তানদের পানি দিতে দেয়নি। তিনি আসলে সেখানে ছিলেন না, তাঁর হৃদয় ও ভালোবাসা ছিল নবীজি ﷺ এবং আল্লাহর প্রতি। তাই তিনি বলেছিলেন "আমাকে এখনই হত্যা করো যেন আমি সেখানে (আখেরাতে) আমার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারি।" হে আহলে সুন্নাতের অনুসারী উম্মতে মুহাম্মদী! তোমাদের গন্তব্যের দিকে ছোটো।

فَفِرُّوا إِلَى اللَّهِ

অর্থ: আল্লাহর দিকে ধাবিত হও (সকল মিথ্যা ও অকল্যাণ থেকে)। (সূরা যারিয়াত, ৫১:৫০)

আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া নেই। সেই ছায়ার জন্য ছোটো এবং আল্লাহ তোমাদের তা দেবেন। নবীজি ﷺ 'ছায়া' বলতে কী বুঝিয়েছেন? আল্লাহ সাত শ্রেণীর মানুষকে ছায়া দেবেন। যেমন তিনি নবীজি ﷺ এর সময়ে এবং পরে অনেক শহীদ দান করেছেন। তাঁরা ছিলেন প্রকৃত শহীদ যারা ন্যায়সঙ্গত কারণে লড়াই করেছিলেন। তারা আজকের দিনের মতো নিরীহ মানুষ হত্যাকারী ছিল না। বরং তাঁরা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ এর ভালোবাসায় জীবন দিয়েছিলেন। যেমন সাইয়্যিদিনা আবু বকর (রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু) যিনি নবীজি ﷺ এর চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন, তিনি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ এর প্রেমে সব কিছু দিয়েছিলেন। এবং সাইয়্যিদিনা উমর (রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু), উসমান (রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু), মাওলা আলী (রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু)। নবীজি ﷺ বলেছেন: যদি আমার পরে কোনো নবী হতো তবে সে হতো উমর। (তাবারানী, আল-হাকিম আল-মুস্তাদরাক-এ) সাইয়্যিদিনা উসমান (রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু) নবীজিﷺ -র দুই কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। প্রথম জন মারা গেলে তিনি দ্বিতীয় জনকে বিয়ে করেন। তাই তিনি ছিলেন ' নবীজি ﷺ এর দুই নূরের' (জুল নূর’আ’য়িন) অধিকারী। তাঁরা দুটি ছায়া এবং তাঁরা উম্মতের ছায়া। সাইয়্যিদিনা খাদিজা, মা ফাতেমা, মাওলা আলী, সাইয়্যিদিনা আল-হাসান, সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিমুস সালাম) এর পোশাক যারা স্পর্শ করবে বা তাঁদের নাম স্মরণ করবে তারা আখেরাতে তাঁদের সাথেই থাকবে। যাদের নাম মুহাম্মদ, আমি খুশি যে আমার নামের একটি অংশ মুহাম্মদ। যে বাবা মায়েরা তাদের সন্তানের নাম 'আব্দ', 'আব্দুল্লাহ', 'আব্দুল হাফিজ' এবং নবীজি ﷺ এর নামের মতো উত্তম নাম বা 'আফদাল আল-আসমা' রাখেন তা আমাদের জন্য একটি ছায়া। তাই আপনারা নিজেদের নাম 'আলী' বা 'মুহাম্মদ' বা 'আবু বকর' বা 'উমর' বা 'উসমান' বা 'হাসান' বা 'হুসাইন' রাখুন, আল্লাহ সেই নামের উসিলায় আপনাদের ছায়া দেবেন। 'পিটার' বা 'জর্জ' এর মতো নাম রাখবেন না, ভালো অর্থবোধক নাম রাখুন।

হে মুসলমানগণ! আশুরা হলো বেদনার দিন, যখন ফেরেশতারা পৃথিবীতে সাইয়্যিদিনা হুসাইন (আলাইহিসসালাম) এবং নবী পরিবারের রক্ত ঝরতে দেখে কেঁদেছিলেন। কল্পনা করুন সমস্ত আহলে সুন্নাত নবী পরিবারকে (আলাইহিসসালাম) মহিমান্বিত ও প্রশংসা করছে, সেখানে তোমরা কীভাবে করাত দিয়ে ঘাড় কেটে শরীর থেকে পবিত্র মস্তক মোবারক বিচ্ছিন্ন করার সাহস পাও? তারা কেবল মাথাই কাটেনি বরং তারা পায়ে লাথি মেরেছিল। আপনারা কি তা কল্পনা করতে পারেন? হে অজ্ঞরা, তোমরা কী বলবে? আমরা বিষয়টি আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিলাম।

আশুরা ক্ষমার দিন। যেদিন আল্লাহ সাইয়্যিদিনা আদম, সাইয়্যিদিনা নূহ, সাইয়্যিদিনা ইব্রাহিম, সাইয়্যিদিনা ঈসা (আলাইহিমুস সালাম) কে ক্ষমা করেছিলেন। নবীজি ﷺ এই দিনে মদিনায় প্রবেশ করেন এবং ইহুদিদের রোজা রাখতে দেখেন। তারা তাঁকে বলল এটি সেই দিন যেদিন আল্লাহ সাইয়্যিদিনা মুসা (আলাইহিসসালাম) কে রক্ষা করেছিলেন। নবীজি ﷺ বললেন "তাদের চেয়ে সাইয়্যিদিনা মুসা (আলাইহিসসালাম) এর ওপর আমাদের অধিকার বেশি।" তাই তিনি সেই দিন রোজা রাখলেন। আপনি যখন সেই দিন রোজা রাখবেন তখন তা গত এক বছরের সমস্ত পাপ মুছে দেবে। কারণ এটি বেদনার ও কষ্টের দিন। আপনারা আহলে বাইতের কষ্টের কথা স্মরণ করেন যারা সাধারণ মানুষ নন বরং পৃথিবীর রাজপরিবার, সুলতান, সম্রাট এবং শাহ, অথচ তাঁদের সেই অপরাধমূলক উপায়ে হত্যা করা হয়েছিল।

কিন্তু আজ তারা কী করছে? আজ আইএসআইএস (উগ্রবাদী সংগঠন) যা কিছু হারাম কাজ করছে, ১৪০০ বছর আগে তারা তার চেয়েও বেশি করেছিল। আইএসআইএস (উগ্রবাদী সংগঠন) রক্তপাত পছন্দ করে, তারা উম্মতের ড্রাকুলা, তারা মানুষের হৃদয়ের রক্ত চুষতে পছন্দ করে। সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম) এর খাতিরে, আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) যেন তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেন যারা ইসলামের নামে বদনাম আনে এবং ঈমানের বদনাম করে। সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন (আলাইহিসসালাম) আমাদের প্রতীক, আমাদের 'রমজ'। আহলে বাইতের ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি কতটা কষ্ট স্বীকার করেছেন তা স্মরণ করে আমাদের তাঁর দিকেই মনোযোগ দিতে হবে। তারা একটি কারণেই তাঁকে নিচে নামিয়েছিল আর তা হলো চেয়ার বা ক্ষমতা। আপনারা চেয়ার চাইবেন না, আপনারা মেঝেকে চান। একটি চেয়ার আপনাদের অহংকার ও দাম্ভিকতা ছাড়া কিছুই দেবে না যা ইবলিসের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু মেঝে আপনাদের সুখ, সন্তুষ্টি এবং বিনয় দেবে যা আপনাদের জান্নাতে নিয়ে যাবে।

আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) যেন আমাদের ডাকার সময় আমাদের রুহ জান্নাতে কবুল করেন এবং সাইয়্যিদিনা মুহাম্মদ ﷺ , সাইয়্যিদিনা আল-হুসাইন, সাইয়্যিদিনা আল-হাসান, মাওলা আলী (আলাইহিমুস সালাম) এবং সাইয়্যিদিনা আবু বকর, সাইয়্যিদিনা উমর, সাইয়্যিদিনা উসমান এবং সমস্ত সাহাবা (রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু) এর বরকতে আমাদের ক্ষমা করেন, যেমন তাঁরা নবীজি ﷺ এর সাহচর্য বা আসহাব আন-নবী ﷺ হিসেবে ছিলেন। আমরা কেউই সাহাবী হতে পারব না তবে আমরা প্রার্থনা করি যেন আল্লাহ তাঁদের যে রহমতের পোশাকে ভূষিত করেছিলেন আমাদেরও তা দান করেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করার তৌফিক দেন।

শেষ করার আগে বলি, আল্লাহ উম্মতকে যে ছায়া দেবেন তার মধ্যে প্রথম ছায়াটি কাকে দেওয়া হবে? নবীজি ﷺ তা বর্ণনা করেছেন এবং ইনশাআল্লাহ আজ রাতে আমরা তা ব্যাখ্যা করব। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি ছায়া পাবে তিনি কেবল 'একজন ইমাম' বলেননি বরং তিনি একটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন, 'ইমামুন আদিল' অর্থাৎ "একজন ইমাম যিনি ন্যায়বিচারের সাথে শাসন করেন"। শর্তটি হলো ন্যায়বিচার। আপনি একজন ইমাম হতে পারেন কিন্তু যদি আপনি ন্যায়পরায়ণ হতে না পারেন তবে আপনার ইমামতি কিছুই না। কারণ আপনি সরকারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে গভর্নরের ইচ্ছা অনুযায়ী ফতোয়া দিয়ে অন্যদের ক্ষতি করবেন যা গ্রহণযোগ্য নয়। আপনাকে আল্লাহ (সুবহানাহু ওয়া তায়ালা) এর ইচ্ছা অনুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে, গভর্নরের ইচ্ছা অনুযায়ী নয়। কারণ গভর্নরের ইচ্ছা দুনিয়ার জন্য আর আল্লাহর ইচ্ছা আখেরাতের জন্য। আপনি যাকে সমর্থন করতে চান তাকে বেছে নিন এবং এগিয়ে যান।

[দোয়া]

[খুতবা সমাপ্ত]

2025 Copyright Sufilive




UA-984942-2